ইয়াস’ ও পূর্ণিমার যুগল প্রভাবে অস্বাভাবিক জোয়ার, নিম্নাঞ্চল প্লাবিত

  • 21
    Shares

SA বাংলা নিউজ

সম্পাদক ও প্রকাশক

সুমন আখন্দ শুভ

রিপোর্ট – সোহাগ খাঁন/ ঢাকা

ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ ও পূর্ণিমার প্রভাবে অস্বাভাবিক জোয়ারে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বেশিরভাগ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চল ছয় থেকে আট ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পানির তোড়ে ভেঙে গেছে কয়েকশ কাঁচা-পাকা রাস্তা। তলিয়ে গেছে অনেক মাছের ঘের ও পুকুর। ক্ষতি হয়েছে রবিশস্যেরও। এর ফলে চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকার নিম্নআয়ের মানুষেরা পড়েছেন চরম বিপাকে।

ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ ও পূর্ণিমার প্রভাবে তেঁতুলিয়া ও লোহালিয়া নদীর পানি স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ছয় থেকে আট ফুট ফুঁসে উঠেছে। এর প্রভাবে চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের প্রায় সব এলাকাই ছয় থেকে আট ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

কালাইয়া ইউনিয়নের চরকালাইয়া ও শৌলা এলাকার নিম্নাঞ্চল পাঁচ থেকে ছয় ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কেশবপুর ইউনিয়নের চরমমিনপুর প্রায় আট ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ওই ইউনিয়নের কালামিয়ার বাজার থেকে মমিনপুর ও হাজিরহাট বাজার পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার কাঁচা-পাকা রাস্তার প্রায় ২৫টি স্থান ভেঙে গ্রামের জনবসতিতে পানি ঢুকে পড়েছে। পানিতে প্রায় দুই শতাধিক পুকুর ও শতাধিক মাছের ঘের তলিয়ে গেছে।

নাজিরপুর ইউনিয়নের নিমদি এলাকার লঞ্চঘাটের পন্টুন পানির তোড়ে মাঝ নদীতে রয়েছে। ধুলিয়া ইউনিয়নের চরবাসুদেবপাশা, কাছিপাড়ার চরপাকডাল, বগার বালিয়া এলাকা লোহালিয়া ও তেঁতুলিয়া নদীর ফুঁসে ওঠা পানিতে ছয় থেকে সাত ফুট তলিয়ে গেছে।

প্লাবিত এলাকার প্রায় সব পুকুর ও মাছের ঘের তলিয়ে গেছে। ফলে মাছ চাষিরা লাখ লাখ টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া পানির তোড়ে ক্ষতি হয়েছে মুগ, মসুর, মরিচ ও তিল-তিসিসহ বিভিন্ন ধরনের রবিশস্যের। ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়নগুলোর বেশিরভাগ অংশেই বেড়িবাঁধ নেই। যতটুকু আছে সেটুকুও মেরামতের অভাবে ভগ্নদশা হয়ে রয়েছে।

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের খাউলিয়া এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে পানিতে ডুবে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার (২৬ মে) দুপুরের দিকে উপজেলার খাউলিয় ইউনিয়নের চালিতাবুনিয়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। মৃত জিনিয়া আক্তার (৪) চালিতাবুনিয়ার নির্মাণ শ্রমিক কালাম গাজীর মেয়ে।

স্থানীয়রা জানায়, বুধবার (২৬ মে) দুপুরে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে জোয়ারের পানি ঢোকে খাউলিয়ার চালিতাবুনিয়া গ্রামে। এ সময় পানি বেড়ে যাওয়া ওই গ্রামের কালাম গাজীর স্ত্রী লিজা বেগম তার শিশুকন্যা জিনিয়াকে ঘরে রেখে গরু আনতে যান। কিছুক্ষণ পরে ঘরে এসে মেয়েকে না পেয়ে খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে তাকে ঘরের পাশে পানিতে পান তিনি। এর পরে মোড়েলগঞ্জ হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বরিশালের বাকেরগঞ্জে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে জোয়ারের পানিতে ডুবে ২ শিশু মারা গেছে। বুধবার (২৬ মে) উপজেলার পৃথক স্থানে এ ঘটনা ঘটে।

মৃত শিশুরা হলেন, সুমাইয়া আক্তার (৩) উপজেলার নিয়ামতি ইউনিয়নের ঢালমারা গ্রামের হাফিজুর রহমানের মেয়ে। আজওয়া আক্তার (৩) গারুরিয়া ইউনিয়নের রুনসী পশুরি গ্রামের আজগর আলীর মেয়ে ।

নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার সুখচর ইউনিয়নে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে লিমা আক্তার (৭) নামের এক শিশু।

বৃহস্পতিবার (২৭ মে) সকাল পর্যন্ত নিখোঁজ শিশুটির কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে নিশ্চিত করেছেন হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরান হোসেন। এর আগে বুধবার (২৬ মে) সন্ধ্যা ৭টার পর থেকে নিখোঁজ হয় ওই শিশু। নিখোঁজ লিমা আক্তার (৭) সুখচর ইউনিয়নের চর আমান উল্যাহ গ্রামের বাবুল মিয়ার মেয়ে।

ঘূর্ণিঝড় ইয়াস ও পূর্ণিমার প্রভাবে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলায় বিষখালী নদীর পানি বেড়ে গেছে। এ সময় পনি ডুবে মারা গেছে দুই শিশু। বুধবার (২৬ মে) বিকেল ৪টার দিকে উপজেলার মেডিকেল মোড় সংলগ্ন ও বড়ইয়া এলাকায় পৃথক এই ঘটনা ঘটে।

মৃত শিশুরা হলেন, সিয়াম (৮) উপজেলার পিংড়ি গ্রামের মো. ফারুক হাওলাদারের ছেলে। তিনি আজিজিয়া নূরানী কিন্ডারগার্টেন মারদাসার দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। সামিয়া আক্তার (৪) বড়ইয়া এলাকার সাইলু আকনের মেয়ে।

রাজাপুরে ব্যাপক হারে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং বিষখালী নদীতে বেড়িবাঁধ না থাকায় পানি ঢুকে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ডুবে গেছে ফসলি জমি, রাস্তাঘাট, ঘর-বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেই সঙ্গে ভেসে গেছে কয়েকশ পুকুরের মাছ।

মোংলায় ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে আশপাশের উপকূলীয় এলাকার নদ-নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ থেকে ৪ ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে পশুর নদীর বাঁধ সংলগ্ন কানাইনগর, চিলা ও জয়মনি এলাকার চারশতাধিক বসতঘর তলিয়ে গেছে। চিংড়িসহ অসংখ্য মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে উপকূলীয় অঞ্চলের আশ্রয়কেন্দ্র গুলোতে কেউ আসেননি।

বুধবার (২৬ মে) দুপুর ২টার দিকে প্লাবিত এলাকা পরিদর্শনে যান মোংলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কমলেশ মজুমদার।

মোংলা চাদপাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোল্লা তারিকুল ইসলাম বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের খামখেয়ালীর কারণে জোয়ারের পানিতে বন্ধী হয়ে পড়েছে চিলা ও চাদপাই ইউনিয়নের ৩ গ্রামের কয়েকশ বাসিন্দা। এ সময় ভেসে গেছে কয়েক হাজার বিঘা মৎস্য ঘেরের মাছ।

এ বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাঠকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ছিলাম। চিলার কেয়াবুনিয়া ও জয়মনি এলাকায় ৫০০ থেকে ৬০০ বিঘা মৎস্য ঘের তলিয়ে যাওয়ার সংবাদ পাওয়া গেছে।

এদিকে বুধবার (২৬ মে) দুপুরে ঘূর্ণিঝড় পরিস্থিতি বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান জানান, ইয়াসের প্রভাবে অতি জোয়ার বা জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় দেশের ৯ জেলার ২৭ উপজেলার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি আরও জানান, ভোলার লালমোহন উপজেলায় গাছ চাপা পড়ে একজন মারা গেছে। আর অতি জোয়ার বা জলোচ্ছ্বাসে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার ২৭টি উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলো হলো- আশাশুনি, শ্যামনগর, দাকোপ, কয়রা, পাইকগাছা, মোংলা, শরণখোলা, মোড়েলগঞ্জ, বরগুনা সদর, মঠবাড়িয়া, পাথরঘাটা, আমতলী, পটুয়াখালী সদর, গলাচিপা, রাঙ্গাবালী, দশমিনা, মির্জাগঞ্জ, কলাপাড়া, চরফ্যাশন, মনপুরা, দৌলতখান, বোরহানউদ্দিন, ভোলা সদর, তজুমদ্দিন, হাতিয়া, কমলনগর ও রামগতি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান বলেন, যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় মানবিক সহায়তা প্রদানের জন্য জেলা প্রশাসকদের অনকূলে পর্যাপ্ত খাদ্যসামগ্রী ও অর্থ বরাদ্দ দেয়া আছে।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ মোকাবেলায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ১৮টি যুদ্ধজাহাজ, মেরিটাইম পেট্রোল এয়ারক্রাফট ও হেলিকপ্টার প্রস্তুত রয়েছে। ঘুর্ণিঝড় পরবর্তী জরুরি উদ্ধার অভিযান পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তিন স্তরের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।

SA BANGLA NEWS